#কৈখালী
- vrvlogshwh
- Aug 12, 2019
- 3 min read

একটানা মাস দুই তিনেকের বেশি কিছুতেই যেন ঘরে মন বসে না। শুধু মনে হয় কোথাও বেরিয়ে পড়ি। কংক্রিটের জঙ্গলে থাকতে থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসে, মাঝে মাঝে মন চায় খোলা মাঠে গিয়ে ছুটে বেড়াতে। দশটা পাঁচটার চেনা গন্ডি পেরিয়ে খোলা আকাশের নীচে বুক ভরে নিশ্বাস নিতে। কিন্তু শুধু মন চাইলেই তো আর হয় না, মধ্যবিত্ত বাঙালি তাই সব কিছু করবার আগে পকেটের দিকে একটু নজর দিতে হয়। অন্যদিকে অফিসে ছুটির কথা তুললেই এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা হয়ে ফাইলের পাহাড় আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরে আমায়। তবু কোনরকমে সব পাহাড় পেরিয়ে একটা শনিবারের ছুটি ম্যানেজ করে ফেললাম। রবিবারের ছুটিটা হাতে আছেই সেই হিসেব করে ঠিক করলাম একটি রাতের জন্য কাছে পিঠে এমন কোথাও বেড়িয়ে আসব যেখানে যাত্রাপথ খুব বেশি কষ্টকর হবে না, সাথে নির্জন প্রকৃতি এবং প্রধান উদ্দেশ্য ফোনটাকে বন্ধ রেখে দুটো দিন পুরোপুরি বিশ্রাম । কিন্তু সব চাইলেই তো আর পাওয়া যায় না, তবে যা পেলাম তা বেশ পছন্দ হলো আমার। সবকিছু ঠিকঠাক করে আমার সমস্ত জায়গার ঘোরার সঙ্গী কে সঙ্গে নিয়ে শনিবার ভোর ভোর নাগাদ বাড়ি থেকে রওনা দিলাম।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা শিয়ালদহ সাউথ স্টেশন থেকে নামখানা লোকাল উঠে বসলাম। যাচ্ছি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কৈখালী। জায়গাটি খুব একটা অপরিচিত নয় কিন্তু সেইভাবে এখনো টুরিস্টের ভীড় বাড়েনি । সাতটা পনেরোর নামখানা লোকাল সকাল আটটা চল্লিশ নাগাদ আমাদের জয়নগর মজিলপুর স্টেশন নামিয়ে দিলো। স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে চা, জলখাবার সেরে নিয়ে জামতলা যাবার অটোতে উঠে বসলাম। জয়নগর থেকে জামতলা যাবার জন্য অটো ছাড়া ও বাস এবং ট্রেকার পাওয়া যায় কিন্তু তাতে ভীড় হয় একটু বেশি তাই অটোতে যাওয়া। কিছুসময় পরেই ছয়জন যাত্রী নিয়ে আমাদের অটো রওনা দিল। একঘন্টা পর তিরিশ টাকা মাথাপিছু ভাড়ার বিনিময়ে অটো আমাদের জামতলা বাজারে নামিয়ে দিলো। রিসর্ট থেকে পাঠানো আরেকটি অটো আমাদের নিয়ে যাবে তাই অপেক্ষা করতে করতে আরো একবার গরম চায়ে চুমুক দিয়ে নিলাম। চা শেষ করে সবেমাত্র একটু সুখটান দেবার জন্য দেশলাই জ্বালিয়েছি এমন সময় আমাদের নিতে অটো এসে হাজির। জামতলা ব্রীজ পেরিয়ে কুলতলি হয়ে তিরিশ মিনিটের মধ্যে এসে পৌছলাম কৈখালী ফার্ম স্টে তে। ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখ জড়িয়ে গেলো। বিঘা দেড়েক জমি নিয়ে মাতলা নদীর ধারে বেশ সুন্দর করে সাজানো এই ফার্ম স্টে। চারিধারে সবুজ মাঠ, আরেক পাশে সুন্দরী মাতলা। বেশ বড়ো মাপের অ্যাটাচড বাথরুম সহ সাজানো দুটি শিততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘর। ঠিক মাঝখানে একটি পুকুর, বেশ কিছু হাঁস তাতে খেলা করে বেড়াচ্ছে। একপাশে খড়ের চালা দেওয়া খাবার জায়গা, পুকুরের আরেকপাশে আরেকটি খড়ের চালা দেওয়া বসার জায়গা করা। ঘরে ব্যাগপত্র রেখেই বাইরে এসে বসলাম। এত সুন্দর প্রাকৃতিক বাতাস ছেড়ে ঘরের ভেতরের যান্ত্রিক বাতাস নিতে একদম ইচ্ছে করছিল না। প্রথমেই ডাবের জল দিয়ে আমাদের স্বাগত জানানো হলো। এরপর গরম গরম চা সাথে বিস্কুট। বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে একটু বেলা হতেই স্নান সেরে গরম ভাত, মুগ ডাল, দু রকমের ভাজা সাথে বাগদা-চিংড়ি এবং ভেটকি মাছ দিয়ে জমিয়ে দুপুরের ভুড়িভোজ সেরে নিলাম। একটু ভাতঘুম নিয়ে বিকেল হতেই গ্রাম দেখতে বেরোলাম। রিসর্ট থেকে একটু বেরিয়ে বাধেঁর রাস্তায় উঠতেই দেখা মিলল ম্যানগ্রোভের সারী সাথে মাতলার অপরূপ সৌন্দর্য। সন্ধ্যা পর্যন্ত কাটালাম মাতলার তীরে। সূর্য অস্ত যেতেই রিসর্টে ফিরে এসে দেখি গরম গরম চা এর সাথে গ্রামের ভাজা মুড়ি, ভেজ পোকোরা এবং মাছ ভাজা রেডি। দেরী না করে সান্ধ্যভোজনের সদগতি করে খোলা আকাশের নীচে চেয়ার টেবিল সাজিয়ে পছন্দের পানীয় সাথে নিয়ে দুই বন্ধু আড্ডা দিতে বসলাম। আমাদের আবদার মতো রঞ্জন দা কাকঁড়া রান্না করে আমাদের টেবিলে দিয়ে গেলো। আড্ডা গল্পে কিভাবে যে সময় কেটে যাচ্ছিল বুঝতেই পারিনি। রাতে গরম গরম রুটি সাথে দেশী চিকেন কষা দিয়ে ডিনার সেরে ঘুমোতে গেলাম। রাত বাড়ার সাথে সাথে একেবারে শান্ত হয়ে পড়ল গ্রামটি সাথে মাতলার গর্জন, সে যেন এক অন্য অনুভূতি। পরদিন সকালটা নাম না জানা পাখির ডাক শুনে শুরু হলো। টুথব্রাশ সঙ্গে নিয়ে বাধের রাস্তা ধরে হেটে হেটে ঘুরে দেখতে লাগলাম এক অন্যরকরম সকাল। গ্রামের মানুষের সন্মতি নিয়ে নিজে হাতে ক্ষেত থেকে বেশ কিছু টাটকা সব্জি তুলে রিসর্টে ফিরে এলাম। সকাল নটা নাগাদ লুচি, তরকারি, ডিমসেদ্ধ সাথে মিষ্টি দিয়ে জলখাবার সেরে নিলাম। বেলা বারোটা নাগাদ আকাশের মুখ ভার হয়ে বৃষ্টি শুরু হলো। বেশ কিছুক্ষণ বৃষ্টি ভিজে মনের আনন্দে পুকুরে একটু দাপাদাপি করে স্নান সেরে ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। দুপুরের খাবার সেরেই আমাদের বাড়ির পথে রওনা দিতে হবে। আজকের লাঞ্চ টা সারলাম ট্যাংরা আর কাতলা মাছ দিয়ে। সত্যি ওনাদের রান্না প্রশংসা করার মতো। খাওয়া দাওয়া সেরে একটু জিরিয়ে নিতে নিতেই আমাদের স্টেশন ফেরার অটো চলে এলো। দুটো দিন একটু নিরিবিলিতে আরাম করে কাটানোর পর আবার ও শিয়ালদহ নামখানা লোকাল এর ভীড় ঠেলতে ঠেলতে বাড়ির পথে রওনা হলাম।
কিভাবে যাবেন - শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে জয়নগর । জয়নগর থেকে অটোতে জামতলা ।জামতলা থেকে আরেকটি অটোতে কৈখালি।
নিজস্ব গাড়িতে কোলকাতা, বারুইপুর, জামতলা হয়ে কৈখালী।
Writer @ Nirob Nishikabbyo



































Comments